আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানো রুবেল হোসেনকে বিশেষ সম্মাননা দিলো বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডে শুরুর আগে সাবেক এই পেসারের সম্মানে রাখা হয় বিশেষ আয়োজন।
টস হেরে বাংলাদেশ দল ফিল্ডিংয়ে নামার আগে গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডে সামনে জড়ো হন দলের ক্রিকেটার, টিম ম্যানেজমেন্টের সদস্যরা। সেখানে রুবেলের হাতে তুলে দেওয়া হয় বিশেষ ক্রেস্ট ও বাধাই করা তিন সংস্করণের তিনটি জার্সি। যেখানে তার ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান লেখা রয়েছে।
এসময় উপস্থিত ছিলেন বোর্ড সভাপতি তামিম ইকবাল ও এডহক কমিটির দুই সদস্য ফাহিম সিনহা ও রফিকুল ইসলাম বাবু এবং সিইও নিজামউদ্দীন চৌধুরি সুজন।
পরে নিজের বক্তব্যে বাবা-মাকে মিস করার কথা বলেন রুবেল।
“আমি আজকে এখানে দাঁড়াতে পেরেছি দুইজন মানুষের জন্য। তারা হলেন আমার বাবা ও আমার মা। যারা আমাকে আন্তরিকভাবে আমাকে সাহস জুগিয়েছে আমার পাশে ছিলেন আমাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছেন। আমি তাদেরকে আজকে খুব মিস করছি।”
গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডের সামনে আয়োজনের পর নিজের ছেলেকে নিয়ে উইকেটের কাছে যান বাংলাদেশের এই সাবেক পেসার। উইকেটের কাছে কিছুক্ষণ বসে থেকে হয়তো খেলোয়াড়ি জীবনের কথাই স্মরণ করছিলেন তিনি।
অবসরের ঘোষণার পর এমন সম্মাননা পাওয়ায় বিসিবির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান রুবেল।
“আমি যখন সোশ্যাল মিডিয়াতে অবসরের সিদ্ধান্ত জানাই, বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল ফোন করে বলেন, ‘রুবেল, তোকে আমরা সম্মানিত করতে চাই।’ যে বিষয়টা আমার কাছে খুবই গর্বের ও আনন্দের ছিল। আর আজকে এত সুন্দর একটা পরিবেশ… এজন্য আমি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট তামিম ইকবালকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।”
২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক অভিষেক হওয়া রুবেলের উত্থান মূলত পেসার হান্টের মাধ্যমে। বাংলাদেশের সাবেক প্রধান কোচ সারোয়ার ইমরান সেই পেসার হান্টে রুবেলকে প্রথম দেখার পর ধীরে ধীরে সুযোগ করে দেন শীর্ষ পর্যায়ের ক্রিকেটে।
দীর্ঘ পর্যায়ের শেষ অধ্যায়ে এসে নিজের শুরুর দিনের সেই কোচের কথাও কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করলেন অভিজ্ঞ পেসার।
“একজন মানুষের নাম না বললেই নয়, আমার রুবেল হোসেন হওয়ার পেছনে যে মানুষটার অবদান অন্যরকম। পেসার হান্ট থেকে থেকে নিয়ে এসে যে আমাকে ওপরে ওঠার সিঁড়ি ধরিয়ে দিয়েছেন, তিনি আমার প্রিয় কোচ শ্রদ্ধেয় সারোয়ার ইমরান স্যার। স্যারের প্রতি আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। স্যারের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।” একইসঙ্গে ক্যারিয়ারে সবসময় পাশে পাওয়ার সবার প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন রুবেল।
“স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে বিসিবির সকল কোচ, গ্রাউন্ডসম্যান, সকল ফিজিক্যাল ট্রেইনার- সবাইকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই যারা আমাকে সমর্থন দিয়েছেন, সাহস যুগিয়েছেন ও আমার পাশে ছিলেন।”
“আমার বন্ধুবান্ধব থেকে শুরু করে যারা খারাপ সময়ে পাশে ছিলেন, মিডিয়াকর্মী সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। আর বিশেষ করে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই যারা আমি যখন জাতীয় দলে খেলা শুরু করি তখন থেকে আজ পর্যন্ত আমাকে সাপোর্ট করে যাচ্ছেন। সবাইকে ধন্যবাদ।”
পাঁচ বছর আগে থেমে গেছে রুবেল হোসেনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ার। বিপিএলে অনিয়মিত, পেছন থেকে একদল পেস বোলার ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করছেন, তাতে জাতীয় দলে দলে ফেরার পথটা রুদ্ধ হয়েছে, তা ধরেই নিয়েছে রুবেল হোসেন। সে কারণেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে নিজের ফেসবুক পেজে দিয়েছিলেন স্টাটাস।
২০২১ সালের এপ্রিলে সর্বশেষ নিউ জিল্যান্ড সফরের দলে জায়গা হয়েছিল রুবেলের। এরপর আর তাকে লাল সবুজ জার্সিতে আর দেখা যায়নি। ২০২০ সালের পর থেকে তিনি আর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেননি। খেলেননি ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের সর্বশেষ আসরেও।
দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ২৭ টেস্টে ৩৬ উইকেট, ১০৪ ওয়ানডেতে ১২৯ উইকেট ও ২৮ টি-টোয়েন্টিতে ২৮ উইকেট নিয়েছেন রুবেল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানালেও ঘরোয়া ক্রিকেট চালিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সেরা সাফল্য ২০১৫ সালে, অস্ট্রেলিয়া-নিউ জিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সেই আসরে বাংলাদেশকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলার নায়ক থেমেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারে ১৯৩ উইকেট নিয়ে। ওডিআই ক্যারিয়ারে বাংলাদেশের সেরা বোলিংয়ে (৬/২৬) মাশরাফিকে ছুঁয়েছেন। তবে অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডকে হারানো বোলিং (৪/৫৪) তার ক্যারিয়ারে সেরা প্রাপ্তি। বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলার নায়ক রুবেলের শেষ স্পেলটি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মাহমুদউল্লাহর সেঞ্চুরি (১০৩), মুশফিকুর রহিমের ৮৯, ৫ম উইকেট জুটিতে এই দুই ভায়রার ১৪৪ বলে ১৪১ রানের কল্যানে ২৭৫/৭ স্কোরকেও নিরাপদ মনে হয়নি। ইয়ান বেল (৬৩), জস বাটলার (৬৫), ক্রিস ওকস (৪২*) বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ভালই নিয়েছিলেন। টেল এন্ডার স্টুয়ার্ট ব্রড সময়োচিত ব্যাটিং করতে পারেন, সেটাই ছিল ভয়ের কারন। তবে রুবেলের ৩ বলের শেষ স্পেল বদলে দিয়েছে ম্যাচের ভাগ্য।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেও ৩৬ বছর বয়সী রুবেল হোসেন ঘরোয়া ক্রিকেটে আরও কিছুদিন খেলতে চান। আসন্ন প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে খেলার জন্য দল খুঁজছেন। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেয়ায় প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে খেলার পথে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন রুবেল হোসেন।
১২ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা ক্রিকেটকে দিতে চান, থাকতে চান ক্রিকেটের সঙ্গে। তার সেই স্বপ্নটা পূরণের দায়িত্ব এখন বিসিবির।

অনলাইন ডেস্ক