ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ও বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. গোলাম সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চিত্রনায়িকা পরীমণির সঙ্গে রাত্রিযাপন ও অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় বিভাগীয় ব্যবস্থা হিসেবে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর জন্য প্রস্তুতকৃত প্রজ্ঞাপনের সারসংক্ষেপে এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্বাক্ষর করেছেন।
এখন সারসংক্ষেপটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়ে রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পাঠানো হবে। পরে রাষ্ট্রপতির আদেশে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। শিগগির এসব প্রক্রিয়া শেষ হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
পরীমণির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ ওঠার পর গোলাম সাকলায়েনকে ডিবি থেকে বদলি করা হয়েছিল। এ ছাড়া অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করার পরে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পায় ওই কমিটি। এরপর ২০২৪ সালের ১৩ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের শৃঙ্খলা-২ শাখার উপসচিব রোকেয়া পারভীন জুঁই স্বাক্ষরিত স্মারকে বিভাগীয় মামলায় তাকে গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরি থেকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর প্রদানে’র বিষয়ে সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়ের (পিএসসিতে) পরামর্শ চেয়ে চিঠি পাঠায়। পিএসসির মতামত নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
২০২১ সালের ৯ জুন রাতে সাভার থানার ঢাকা বোট ক্লাবে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে একই বছরের ১৪ জুন ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন পরীমণি। সেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন গোলাম সাকলায়েন। পরে একাধিক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে খবর বের হয়, সাকলায়েনের বাসায় পরীমণির যাতায়াত ছিল। ২০২১ সালের ১ আগস্ট সকালে পরীমণি নিজের গাড়ি নিয়ে সাকলায়েনের বাসায় যান এবং গভীর রাতে বেরিয়ে আসেন। গাড়ি থেকে নেমে তাদের দুজনের ওই বাসায় ঢোকা এবং বের হওয়ার ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়।
পিএসসিতে পাঠানো শৃঙ্খলা শাখার ওই স্মারকে বলা হয়,তিনি নায়িকা পরীমণির বাসায় নিয়মিত রাত্রিযাপন করতে শুরু করেন। পুলিশ অধিদপ্তরের এলআইসি শাখা থেকে দেওয়া তার ফোনের সিডিআর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৪ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন সময়ে (দিনে ও রাতে) নায়িকা পরীমণির বাসায় অবস্থান করেছেন।
নায়িকা পরীমণির মোবাইল ফোন (সিআইডি কর্তৃক মামলার আলামত হিসেবে জব্দকৃত) ফরেনসিক রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, তার ও পরীমণির আদান-প্রদানকৃত মেসেজগুলো একই বছরের ২৯ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট সামসুন্নাহার স্মৃতি ওরফে পরীমণির ফেসবুক আইডি ও গোলাম সাকলায়েন সিথিল নামে ফেসবুক মেসেঞ্জারে কথোপকথন এবং তাদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে (১১ জুলাই-৪ আগস্ট ২০২১) কথোপকথন সাধারণ পরিচিতি বা পেশাগত প্রয়োজনে স্থাপিত কোনো সম্পর্কের নয়; বরং অনৈতিক প্রেমের সম্পর্ক।
২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর সিআইডির ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ১ আগস্ট, ২০২১ তারিখে গোলাম সাকলায়েন তার পূর্বপরিকল্পনা ও সম্পূর্ণ জ্ঞাতসারে তার স্ত্রী না থাকা অবস্থায় নায়িকা পরীমণি তার রাজারবাগে সরকারি বাসায় যায় এবং প্রায় ১৭ ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করে, পরদিন ২ আগস্ট রাত ১টা ৩০ মিনিটে বাসা ত্যাগ করেন।
সাকলায়েন বিবাহিত ও এক সন্তানের জনক। এর পরও পরীমণির সঙ্গে তার বিবাহবহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন, পরীমণির সঙ্গে জন্মদিন উদ্যাপন এবং নিজের সরকারি বাসভবনে নিজ স্ত্রীর অবর্তমানে সময় কাটানোর মতো ঘটনা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষু্ন্ন করেছে।
গোলাম সাকলায়েনের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর দায়ে অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণী জারি করা হয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তা আনা অভিযোগের জবাব প্রদানপূর্বক ব্যক্তিগত শুনানি প্রার্থনা করেন।
বিভাগীয় মামলাটি তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য জননিরাপত্তা বিভাগের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) হায়াত-উদ-দৌলা খাঁনকে বলা হয়। তদন্তে তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে মর্মে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সার্বিক পর্যালোচনার পর দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর জবাব সন্তোষজনক বিবেচিত না হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ এর অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তা গোলাম সাকলায়েনকে একই বিধিমালার বিধি ৪-এর উপবিধি ৩(খ) বিধি মোতাবেক ‘গুরুদণ্ড’ হিসেবে চাকরি থেকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান’-এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে এ ব্যাপারে সাকলায়েন ও পরীমণির কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। একাধিকবার ফোন করার পরও রিসিভ করেননি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অনলাইন ডেস্ক