ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের কাছাকাছি অবস্থিত দিল্লির ঐতিহাসিক রেসকোর্স মসজিদটিকে ৬ দিনের মধ্যে খালি করার উচ্ছেদ নোটিশ দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমি ও উন্নয়ন দপ্তর । এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তবে নোটিশের বিষয়টি এবং এর পেছনের পরিস্থিতি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মসজিদটির ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ হারুনের অভিযোগ, গত ৭ অক্টোবর মসজিদের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ৬ দিনের মধ্যে মসজিদ প্রাঙ্গণ খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। মসজিদটি রক্ষার দাবিতে জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের একটি প্রতিনিধিদল ভারতের কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে।
কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগরবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন ভূমি ও উন্নয়ন দপ্তর দাবি করেছে, এই শতবর্ষী মসজিদটি সরকারি জমিতে কোনো অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে। তাই এটিকে ‘অননুমোদিত স্থাপনা’ বা জবরদখল হিসেবে চিহ্নিত করে ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে খালি করার নোটিশ দেওয়া হয়।
অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসিও মসজিদটি ভেঙে ফেলার আশঙ্কার খবরের মধ্যে রিজিজুর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। মসজিদটির আইনি মর্যাদা এবং জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধই এখন এ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মসজিদটি নিয়ে তিনটি উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন ওয়াইসি। তিনি বলেন, মসজিদটি সরকারি গেজেটে তালিকাভুক্ত ওয়াক্ফ সম্পত্তি। তা হলে ওয়াক্ফ বোর্ড কেন এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেনি, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। পাশাপাশি বর্তমানে দিল্লিতে কোনো ওয়াক্ফ বোর্ড নেই বলেও উল্লেখ করেন ওয়াইসি।
বিতর্ক তীব্র হওয়ার মধ্যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রিজিজুকে বিষয়টিতে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান তিনি। একই দাবিতে জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের প্রতিনিধিদলও মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছে।
মসজিদ কর্তৃপক্ষের দাবি, ওয়াক্ফ আইনের আওতায় সম্পত্তিটি সুরক্ষিত। তবে জমির আইনি মর্যাদা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। উচ্ছেদের নোটিশ সম্পর্কে সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।
ছয় দিনের মধ্যে মসজিদ খালি করার নোটিশ দেওয়ার খবর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হুরিয়ত নেতা মিরওয়াইজ উমর ফারুকও।
মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ হারুন এবং মুসলিম সংগঠনগুলোর দাবি, এই রেসকোর্স মসজিদটি ১০০ থেকে ১৫০ বছরের পুরোনো একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা।
এটি ১৯৭৭ সাল থেকে ভারতের সরকারি গেজেটে তালিকাভুক্ত একটি ওয়াক্ফ সম্পত্তি। এছাড়া নয়াদিল্লি পৌর কাউন্সিল (NDMC)-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটেও এটিকে সংরক্ষিত ঐতিহ্যবাহী সম্পত্তির (Heritage Property) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে।
মিরওয়াইজ বলেন, দিল্লির ঐতিহাসিক রেসকোর্স মসজিদ, যা ১৯৭৭ সাল থেকে সরকারি গেজেটে তালিকাভুক্ত ওয়াক্ফ সম্পত্তি এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, সেটিকে ছয় দিনের মধ্যে উচ্ছেদের মুখে পড়তে হচ্ছে—এটি গভীরভাবে উদ্বেগজনক।
সম্পত্তিটি রক্ষায় ওয়াক্ফ কর্তৃপক্ষের কথিত নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। মুসলিমদের উপাসনালয়ের বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপ স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও রাখেন মিরওয়াইজ।
ওয়াক্ফ আইনের সংশোধনী এবং মুসলিমদের ধর্মীয় সম্পত্তির ওপর সরকার-মনোনীত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে অধিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। মসজিদটি রক্ষায় বিভিন্ন মহল থেকে হস্তক্ষেপের দাবি ওঠার মধ্যেই তার এ বক্তব্য এল।
ভারতের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম সংগঠন জামিয়াত উলামায়ে হিন্দ-এর একটি প্রতিনিধিদল কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি জমা দিয়েছে। তারা মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া বন্ধ করা এবং বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দ্রুত সচল করার দাবি জানিয়েছে। মন্ত্রী রিজিজু বিষয়টি সমাধানে সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা করার আশ্বাস দিয়েছেন।

থার্ডআই অনলাইন/ আন্তর্জাতিক ডেস্ক