৫০ বছর ধরে চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বাংলাদেশের। আওয়ামী সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের দৃশ্যমান অবনতি ঘটে। নির্বাচনের আগে একাধিকবার চীন সফর করে বিএনপি। একই সময় জামায়াত, এনসিপি ও তাদের সমমান দলের নেতৃবৃন্দ চীন সফরে যান।
দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো গেল দুই বছরে একাধিকবার চীন সফর করেছে। আগামী জুনে সম্ভাব্য প্রথম বিদেশ সফরে চীন যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিনিয়োগ-বাণিজ্য ছাড়িয়ে রাজনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নকেই এসব সফরের বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বৈরিতায় বাংলাদেশকে কাছে টেনে নিয়েছে দেশটি। তাদের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে বলেও মত তাদের।
সরকার গঠনের পরও বিএনপি নেতারা চীন সফর করেছেন। সবশেষ চীন সফরে গেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
আগামী জুনে সম্ভাব্য চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলের ঊর্ধ্বতন এ নেতা বলছেন, বিএনপির উচ্চপর্যায়ের সফরটি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষকরা বলছেন, দলগুলোর ঘনঘন সফর রাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিত হলেও বড় আকর্ষণ হচ্ছে চায়না বিনিয়োগ। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের বৈরিতার কারণেও বাংলাদেশকে আরও কাছে টেনেছে দেশটি। যদিও সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অর্থনৈতিক সম্পর্কের দিক থেকে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গবেষক ড. বেনুকা ফেরদৌসী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কিন্তু ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ফলে এটা হতেই পারে যে এ ফাঁকা মাঠটাকে চীন হয়তো একটু বাড়তি কাজে লাগাতে যাচ্ছে তার যে প্রভাব বলয় এটা বাড়ানোর জন্য, তার ন্যারেটিভটাকে প্রসারের জন্য বা তার সম্পর্কটা অন্যদের সঙ্গে বৃদ্ধি করার জন্য।’
সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলছেন, অসম শর্ত ছাড়া চীন যেকোনো সহায়তায় এগিয়ে আসে। দেশটি থেকে বিনিয়োগ, ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিতে পারলে বাংলাদেশের আরও বেশি এগিয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে।
চীন বাংলাদেশ দূতাবাসের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘আমরা যেটা অ্যাফোর্ড করতে পারি তাতে ভালো প্রযুক্তি চীনের কাছ থেকে পাওয়া যায়। আমার পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত চেষ্টা করলেও সেটা দিতে পারবে না, তার সেটার যথেষ্ট সরবরাহ নাই। অন্যান্য দেশ বিভিন্ন রকমের অসম শর্ত দিয়ে সহযোগিতা করে, চীন সেটা করে না—সেই জন্য আরেকটা কারণ যার জন্য চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা এগিয়েছে এবং আরও এগোবে।’
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ‘এ জুন মাসের প্রস্তাবিত সফরটির একটি ক্ষেত্র আমরা প্রস্তুত করে দিয়ে আসছি সেটি বলতে চাই না, বাট একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। চীন সফরে যেটা সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে চীন যে কাজগুলো করেছে, তার অনুকরণে আমরা অনেকগুলো মানে প্রকল্প আমরা আমাদের বাংলাদেশে নিতে পারি।’
যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক যুদ্ধে জড়ানোর কারণে বিশ্বব্যাপী চীনের রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়ে গেছে। তাই দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ এই দেশের সঙ্গে তাল মেলাতে চায় এনসিপিও।
জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, ‘চায়নার যে রাজনৈতিক ইম্পর্টেন্স সেটা তো পৃথিবীব্যাপী দিনকে দিন বাড়ছে। এ রাজনৈতিক ইম্পর্টেন্সের সঙ্গে আসলে এনসিপিকে তাল মেলাতে চাচ্ছে কি না? অবশ্যই। আমরা যেকোনো ধরনের নতুন রাজনৈতিক পোলারাইজেশন, নতুন রাজনৈতিক যদি বন্দোবস্ত তৈরি হয় সেটার সঙ্গে বাংলাদেশ তথা এনসিপি তো তাল মিলিয়ে চলতেই চাইবে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চীন সফরের মাধ্যমে দেশটির সঙ্গে সম্পর্কে নতুন মাত্রা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে গুরুত্ব পাবে তিস্তা আলোচনা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়। যাতে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদী লাভবান হবার সম্ভাবনা রয়েছে।