ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ শিক্ষকের শাস্তি প্রত্যাহারের দাবি শিক্ষক সমিতির
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সিন্ডিকেট কর্তৃক গত দুই বছরে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তিপ্রাপ্ত ১০ শিক্ষকের শাস্তি প্রত্যাহারের জোর দাবি জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে শিক্ষক সমিতি এই দাবি উত্থাপন করে।একইসঙ্গে একটি সুশৃঙ্খল ও মেধাভিত্তিক একাডেমিক পরিবেশ এবং নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ ফিরিয়ে আনারও আহ্বান জানিয়েছে তারা।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপককে স্থায়ী বহিষ্কার এবং ছয়জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি প্রদানের যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি তার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো নির্দেশনা অনুযায়ী নয়, বরং ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩’-এর আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। উল্লিখিত আইন অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীর অপরাধ অনুসন্ধান কমিটি ও ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের কোনো শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা রাখে না।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ইতোপূর্বে গত ২২ জুন অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় তিনজন শিক্ষককে একইভাবে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। ১৯৭৩-এর আইন অনুযায়ী তথ্যানুসন্ধান কমিটি, তদন্ত কমিটি এবং ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে এসব শিক্ষককে আত্মপক্ষ সমর্থন, স্বীয় বক্তব্য প্রদান এবং অভিযোগ উত্থাপনকারীদের মুখোমুখি বা সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে বক্তব্য খণ্ডন করার বিন্দুমাত্র সুযোগ দেওয়া হয়নি। এটি পরিষ্কারভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও দীর্ঘ ঐতিহ্যের লঙ্ঘন, মানবাধিকারের লঙ্ঘন এবং সমান অধিকার প্রাপ্তির চরম লঙ্ঘন।
শিক্ষক সমিতি বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ববর্তী অনির্বাচিত প্রশাসন মব সৃষ্টির মাধ্যমে একটি একপাক্ষিক নীতি অনুসরণ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধিমালা উপেক্ষা করে প্রায় ৭০-৮০ জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়েছে এবং বিভিন্ন ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে তাদের সামাজিকভাবে অসম্মানিত করার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, যা মূলত মানসিক ও অর্থনৈতিক নিপীড়নের নামান্তর। পূর্ববর্তী প্রশাসন নির্বাচিত সিনেট, সিন্ডিকেট ও শিক্ষক সমিতিকে অকার্যকর করার মাধ্যমে এ ধরনের আইনবহির্ভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিদের জোরপূর্বক বিরত রেখে একতরফাভাবে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে, তা কখনোই সুবিচার নিশ্চিত করবে না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমান প্রশাসন দুই বছর আগে শাস্তিপ্রাপ্ত শিক্ষককে পুনরায় শাস্তি প্রদান করে শাস্তির মাত্রা দ্বিগুণ করেছে।
তাদের ভাষ্যে, বিশ্ববিদ্যালয় মূলত বিভিন্ন মত, পথ ও দর্শনের বৈচিত্র্য এবং সমন্বয়ে পরিচালিত জ্ঞানার্জনের প্রতিষ্ঠান। পরমতসহিষ্ণুতা, বহুত্ববাদ, স্বাধীন গবেষণা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে লালন ও ধারণ করাই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চেতনা। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অতীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজ্ঞাবান, অভিজ্ঞ এবং জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের শাস্তি প্রদানের ঘটনা বিরল। কেবল মুক্তিযুদ্ধকালীন ১৯৭১ সালে জাতিগত নিধনের প্রক্রিয়া হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মেধাশূন্য করার লক্ষ্যে সংঘটিত হয়েছিল নৃশংস বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কিন্তু কেবল রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে ভিন্নমত দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচনের নীতি এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষক-সমাজের মধ্যে যে আতঙ্ক, ভীতি ও অনিরাপত্তার সংস্কৃতি সৃষ্টি করা হলো, ভবিষ্যতের জন্য তা একটি অশুভ দৃষ্টান্ত হিসেবে থেকে যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন রাখতে এবং দল, মত, লিঙ্গ ও ধর্মভেদে শিক্ষকদের পারস্পরিক সহাবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে, বলছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি।
উল্লেখ্য, গত ২৮ জুলাই পৃথক অভিযোগে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিমসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া, চার শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

গণপরিবহনে আজ থেকে জিপিএস বাধ্যতামূলক

















